হযরত নূহ (আ.)-এর জীবনী

 হযরত নূহ (আ.)-এর জীবনী


আদম (আ.) থেকে শুরু হওয়া মানব ইতিহাস ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে। তাঁর সন্তান-সন্ততিরা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং নিজেদের জীবনের নানা প্রয়োজন মেটাতে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকলা এবং সভ্যতার নানা চর্চা শুরু করে। সময়ের সাথে সাথে তাঁরা প্রকৃত তাওহীদ থেকে সরে এসে বিভিন্ন ভুলপথে চলে যায়। আল্লাহর একত্ববাদী দাওয়াত ধীরে ধীরে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যেতে থাকে। মানুষ শয়তানের প্ররোচনায় তাদের সৎকর্মশীল ও আল্লাহভীরু পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে সম্মান করার জন্য প্রতিমা বানাতে শুরু করে, এবং কিছু সময় পর সেই প্রতিমাই উপাস্যরূপে পূজিত হতে থাকে। মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ইবাদতের পরিবর্তে বহু দেবতার ধারণা জন্ম নেয়, যা ছিল তাওহীদের পথ থেকে ভয়ঙ্কর বিচ্যুতি।

এই সময়ে আল্লাহ তাঁর রহমত থেকে মানবজাতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে একজন রাসূল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই নির্বাচিত বান্দাই ছিলেন হযরত নূহ (আ.)। তাঁকে আল্লাহ তাঁর জাতির জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে পাঠালেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন— “আমি নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করলাম, তখন তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের কোনো উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্য এক ভয়ঙ্কর দিনের শাস্তি আশঙ্কা করছি।” (সূরা আল-আ’রাফ 7:59)।

নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে প্রথম দিন থেকেই তাওহীদের দিকে ডাকতে শুরু করলেন। তিনি স্পষ্টভাবে বললেন, তোমরা মূর্তিপূজা ত্যাগ কর এবং কেবল আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি তাঁদের সতর্ক করলেন যে, এই ভ্রান্ত পথ থেকে ফিরে না এলে আল্লাহর কঠিন শাস্তি তাঁদের উপর নেমে আসবে। কিন্তু তাঁর জাতির প্রভাবশালী নেতারা তাঁর কথাকে গুরুত্ব দিল না। তাঁরা তাঁকে উপহাস করে বলল, তুমি তো আমাদের মতো একজন মানুষ, তোমার কোনো বিশেষত্ব নেই। তুমি যদি সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসো, তবে তোমার কাছে কোনো অলৌকিক নিদর্শন থাকা উচিত ছিল। তাঁদের এই অবিশ্বাস নূহ (আ.)-এর অন্তরে দুঃখ সৃষ্টি করলেও তিনি ধৈর্য ধরে তাঁদের আহ্বান জানাতে থাকলেন।

নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বোঝানোর জন্য ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতেন। কখনো তিনি বড় সমাবেশে সবার সামনে বলতেন, কখনো কারো সঙ্গে একান্তে কথা বলতেন, কখনো গোপনে উপদেশ দিতেন, আবার কখনো প্রকাশ্যে সতর্ক করতেন। তিনি বলতেন— “হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো তোমাদের জন্য একজন স্পষ্ট সতর্ককারী, যাতে তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর তাকওয়া অবলম্বন করো এবং আমার আনুগত্য করো। তিনি তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের অবকাশ দেবেন।” (সূরা নূহ 71:2-4)।

তাঁর দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল তিনটি: এক আল্লাহর ইবাদত করা, নবীর আনুগত্য করা এবং আল্লাহর আযাবের ভয়কে অন্তরে ধারণ করা। কিন্তু তাঁর জাতির মানুষ অহংকারে অটল থেকে বলত, আমরা তো তোমাকে আমাদের মতোই একজন মানুষ হিসেবে দেখি, তোমার প্রতি ঈমান আনতে আমাদের কোনো কারণ নেই। তাঁরা নূহ (আ.)-এর অনুসারীদের নিয়ে উপহাস করত, কারণ তাঁর অনুসারীরা মূলত দরিদ্র, নিপীড়িত, সমাজের তুচ্ছ-অবহেলিত মানুষ ছিল। ধনী ও ক্ষমতাবানরা বলত, আমরা এসব গরীব মানুষের সঙ্গে সমান হতে পারি না।

নূহ (আ.) ধৈর্যের সঙ্গে বারবার বলতেন, আমি তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো কেবল আল্লাহর কাছেই রয়েছে। তিনি বোঝাতে চাইতেন যে তাঁর দাওয়াত ব্যক্তিগত স্বার্থ বা লাভের জন্য নয়, বরং কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। তবুও তাঁর জাতির মানুষ বারবার জেদ ধরে তাঁকে প্রত্যাখ্যান করত। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন— “তারা বলল, আমরা তো তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখতে পাচ্ছি।” (সূরা আল-আ’রাফ 7:60)।

 নূহ (আ.) বিনম্রভাবে উত্তর দিলেন, আমি কোনো ভ্রান্তিতে নেই, আমি তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে পাঠানো এক রাসূল।

এইভাবে বছরের পর বছর নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে দাওয়াত দিতে থাকলেন। তিনি রাত্রি-দিন আল্লাহর পথে ডাকতেন। কখনো আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আহ্বান করতেন, কখনো আযাব ও ধ্বংসের ভয় দেখিয়ে সতর্ক করতেন। তিনি বলতেন— “তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি অধিক ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর প্রাচুর্যময় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধি করবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান সৃষ্টি করবেন এবং নদী প্রবাহিত করবেন।” (সূরা নূহ 71:10-12)।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, তাঁর দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরেও খুব অল্পসংখ্যক মানুষ তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল। জাতির সংখ্যাগরিষ্ঠ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাঁরা কানে আঙুল দিয়ে তাঁর কথা শোনার থেকে বিরত থাকত, কাপড় দিয়ে নিজেদের ঢেকে নিত, যাতে তাঁর দাওয়াত তাঁদের কাছে পৌঁছাতে না পারে। তাঁরা জেদ ও অহংকারে আরও শক্ত হয়ে যেত। নূহ (আ.) নিজের জাতির প্রতি গভীর মমতায় ক্লান্তিহীন পরিশ্রম করতেন, তাঁদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন, কিন্তু তাঁদের হৃদয় এতটাই কঠোর ছিল যে তাঁরা তাঁর কথায় কর্ণপাত করত না।

এভাবে শুরু হলো নূহ (আ.)-এর দীর্ঘ দাওয়াতের জীবন, যেখানে তিনি অবিশ্বাসীদের অবজ্ঞা ও বিদ্রুপ সত্ত্বেও আল্লাহর নির্দেশ পালন করে গেছেন। তিনি ছিলেন ধৈর্যের প্রতীক, সত্যের আহ্বায়ক, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো এক মহান রাসূল, যিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কেবল আল্লাহর একত্বের দিকে মানুষকে ডাকতে থেকেছেন।

হযরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে অবিরাম আহ্বান জানালেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তিনি তাঁদের সামনে তাওহীদের দাওয়াত তুলে ধরলেন। তিনি কখনো রাত্রে গোপনে মানুষের দরজায় গিয়ে বলতেন, কখনো দিনের বেলায় বড় সমাবেশে সবার সামনে ঘোষণা করতেন। তিনি বারবার বুঝিয়ে দিতেন যে মূর্তি ও প্রতিমা মানুষের কোনো উপকারে আসে না, বরং এগুলো আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার ভয়ঙ্কর পাপ। তিনি তাঁদের আল্লাহর ক্ষমা ও রহমতের আশ্বাস দিয়ে বলতেন, তোমরা যদি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তাহলে তিনি তোমাদের জীবনে কল্যাণের দরজা খুলে দেবেন, বৃষ্টি পাঠাবেন, ভূমি উর্বর করবেন, সন্তান-সম্পদ বাড়িয়ে দেবেন।

কিন্তু তাঁর জাতির নেতারা ও ধনী-অহংকারী মানুষ এসব কথা শোনার বদলে তাঁকে অপমান করত। তাঁরা বলত, তুমি তো আমাদের মতোই একজন মানুষ, তোমাকে মানার কোনো কারণ নেই। তাঁরা নূহ (আ.)-এর অনুসারীদের নিয়ে বিদ্রুপ করত, কারণ তাঁরা ছিল দরিদ্র ও সাধারণ মানুষ। নূহ (আ.) তাঁদের সামনে দৃঢ়ভাবে বললেন, আমি তোমাদের কাছ থেকে কোনো সম্পদ চাই না, আমার প্রতিদান তো কেবল আল্লাহর কাছেই। তিনি আরও বললেন, আমি তোমাদের দরিদ্র অনুসারীদের তাড়িয়ে দেব না, কারণ তাঁরাও আল্লাহর বান্দা, তাঁদের অগ্রাহ্য করা আমার কাজ নয়। এতে বোঝা যায় যে, নূহ (আ.) শুধু তাওহীদের দাওয়াত দেননি, বরং সমতার বার্তাও প্রচার করেছেন।

কুরআনে আল্লাহ বলেন, নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে এভাবে আহ্বান করেছিলেন: “হে আমার সম্প্রদায়! আমি যদি আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে থাকি এবং তিনি আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে রহমত দান করে থাকেন, অথচ তোমাদের কাছে তা অস্পষ্ট হয়ে গেছে, তাহলে আমি কি তোমাদের উপর তা জোরপূর্বক চাপিয়ে দিতে পারি? হে আমার সম্প্রদায়! আমি তো তোমাদের কাছ থেকে কোনো প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো আল্লাহর কাছেই। আমি মুমিনদের তাড়িয়ে দিতে পারি না। নিশ্চয়ই তারা তাদের প্রতিপালকের সাক্ষাত লাভ করবে, কিন্তু আমি তোমাদেরকে অজ্ঞ মানুষরূপে দেখছি।” (সূরা হূদ 11:28-29)।

তাঁর দীর্ঘ দাওয়াতের পরও যখন মানুষরা তাওহীদের পথে ফিরল না, তখন আল্লাহ তাঁকে আকাশ থেকে বড় শাস্তির হুমকি দিলেন। নূহ (আ.) গভীর কষ্টে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, আমি আমার জাতিকে রাতদিন আহ্বান করেছি, কিন্তু তারা আরও দূরে সরে গেছে। আমি যতই তাঁদের ডাকি, ততই তারা কানে আঙুল ঢেকে ফেলে, কাপড়ে নিজেদের ঢেকে নেয় এবং অহংকারে অটল থাকে। তাঁরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং নিজেদের ধনসম্পদ ও সন্তান নিয়ে গর্ব করতে লাগল। তাঁরা বলত, তোমার কথার কোনো ভিত্তি নেই, আমাদের পূর্বপুরুষরা যেমন উপাসনা করেছে, আমরাও তাই করব।

নূহ (আ.) তখন আল্লাহর কাছে মোনাজাত করলেন— “হে আমার প্রতিপালক! তাদের অমান্য করা আমাকে ক্লান্ত করে তুলেছে। আমি তো তাদেরকে আহ্বান করেছি যাতে তুমি তাদের ক্ষমা কর, কিন্তু তারা আমার আহ্বানকে নিজেদের ক্ষতিই মনে করেছে। আমি যতবারই তাদেরকে ডেকেছি, তারা কানে আঙুল ঢুকিয়ে ফেলেছে, নিজেদের পোশাক দিয়ে ঢেকে নিয়েছে এবং অহংকারে একেবারেই অটল থেকেছে। তারপর আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে আহ্বান করেছি। আবার আমি তাদের সাথে গোপনে কথাও বলেছি। আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় ক্ষমাশীল।” (সূরা নূহ 71:5-10)।

এত বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন দাওয়াত দেওয়ার পরও যখন জাতি তাঁর প্রতি ঈমান আনল না, তখন তিনি হতাশ হয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন যে, হে আল্লাহ, এরা তো আর কখনো সঠিক পথে আসবে না। তাই এদের ধ্বংস কর এবং পৃথিবীকে এই অবিশ্বাসীদের থেকে মুক্ত কর। কুরআনে উল্লেখ আছে, তিনি প্রার্থনা করেছিলেন— “হে আমার প্রতিপালক! পৃথিবীতে কোনো অবিশ্বাসীকে যেন তুমি ছেড়ে না রাখো। নিশ্চয়ই তুমি যদি তাদের ছেড়ে দাও, তাহলে তারা তোমার বান্দাদের বিভ্রান্ত করবে এবং তারা কেবল অশুভকর্মে লিপ্ত সন্তান জন্ম দেবে।” (সূরা নূহ 71:26-27)।

আল্লাহ তাঁর এই দোয়া কবুল করলেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিলেন একটি বিশাল নৌকা নির্মাণ করতে। এটি ছিল এমন এক নৌকা, যা আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী তৈরি হবে। আল্লাহ তায়ালা বললেন— “আর আমার প্রতি ওহি হলো যে, তুমি আমার চোখের সামনেই এবং আমার নির্দেশ অনুসারে নৌকা নির্মাণ কর।” (সূরা হূদ 11:37)।

নূহ (আ.) তাঁর অনুসারীদের সঙ্গে মিলে বিশাল এক নৌকা তৈরি করতে শুরু করলেন। তিনি কাঠ সংগ্রহ করলেন, বড় বড় গাছ কেটে জোড়া লাগালেন এবং আল্লাহর নির্দেশিত কাঠামোয় কাজ শুরু করলেন। নৌকার দৈর্ঘ্য ছিল কয়েকশত হাত লম্বা ও প্রস্থে বিস্তৃত, যা মানুষের ইতিহাসে এক অনন্য নির্মাণকর্ম। যখনই নূহ (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা নৌকা বানাতেন, তখন জাতির লোকেরা এসে তাঁদের উপহাস করত। তাঁরা বলত, হে নূহ, তুমি মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে নৌকা বানাচ্ছ, এখানে তো কোনো নদী বা সাগর নেই, তাহলে এই নৌকার প্রয়োজন কী? তাঁরা হাসতে হাসতে বলত, তুমি তো এখন কাঠমিস্ত্রি হয়ে গেছো।

কিন্তু নূহ (আ.) ধৈর্য ধরতেন। তিনি তাঁদের বলতেন, আজ তোমরা আমাদের নিয়ে হাসছ, কিন্তু একদিন এমন আসবে যখন তোমরা কাঁদবে আর আমরা বাঁচব। তিনি জানতেন, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।

নৌকা বানানো শেষ হলে আল্লাহ তাঁকে নির্দেশ দিলেন, প্রতিটি প্রাণীর জোড়া জোড়া নিয়ে নৌকায় ওঠাতে। পাশাপাশি ঈমানদারদেরও নৌকায় চড়ার আদেশ দেওয়া হলো। নূহ (আ.) তাঁর পরিবার ও ঈমানদারদের নিয়ে নৌকায় উঠলেন। তবে তাঁর স্ত্রী ও একজন পুত্র ঈমান আনেনি, তারা অবিশ্বাসীদের দলে ছিল। নূহ (আ.) বহুবার তাঁদের ডাকলেও তারা তাওহীদের পথে আসেনি।

এই হলো সেই মুহূর্ত যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে মহাপ্লাবনের আযাব আসতে শুরু করল। আকাশ থেকে প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হলো, পৃথিবীর ভেতর থেকে পানি উথলে উঠল। ধীরে ধীরে সমস্ত ভূমি পানিতে তলিয়ে গেল। মানুষের বাড়িঘর, গাছপালা, পশুপাখি সবকিছু ধ্বংস হতে লাগল। কেবল সেই নৌকাই ভাসতে থাকল, যাতে নূহ (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা ছিলেন।

এই অংশে হযরত নূহ (আ.)-এর জীবনী এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছাল, যেখানে ধৈর্য, দাওয়াত ও আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাসের পরিণতি স্পষ্টভাবে দেখা গেল। তাঁর দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রমের পর যখন জাতি সত্যকে প্রত্যাখ্যান করল, তখন আল্লাহর প্রতিশ্রুত আযাব নেমে এল, এবং যারা ঈমান এনেছিল তারা নিরাপদে রক্ষা পেল।

প্রবল বৃষ্টি যখন শুরু হলো, তখন আকাশ অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। মেঘের গর্জন আর বজ্রপাতের শব্দে চারদিক কেঁপে উঠতে লাগল। ভূমির ভেতর থেকে ফোয়ারা আকারে পানি বেরিয়ে আসতে থাকল, যেন পৃথিবীর প্রতিটি স্তর ফেটে গিয়ে জলধারা উথলে উঠেছে। আকাশ থেকেও ঝড়ো বৃষ্টির স্রোত নেমে এলো। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তারা বুঝতে পারল, এটি কোনো সাধারণ বৃষ্টি নয়, বরং আল্লাহর আযাব। যারা নূহ (আ.)-এর দাওয়াতকে অগ্রাহ্য করেছিল, তারা প্রাণ বাঁচাতে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল। কেউ পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে চেষ্টা করল, কেউ গাছের মগডালে আশ্রয় নিতে লাগল। কিন্তু কোথাও কোনো আশ্রয় মিলল না, কারণ আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচার পথ কেবল ঈমান আর আনুগত্যে ছিল, কোনো পার্থিব আশ্রয়ে নয়।

নূহ (আ.)-এর নৌকা তখন ঢেউয়ের উপর ভেসে চলছিল। আল্লাহর কুদরতে সেই বিশাল নৌকা যেন পাহাড়সম ঢেউয়ের সাথে লড়াই করেও টিকে ছিল। ভেতরে ছিলেন নূহ (আ.), তাঁর ঈমানদার অনুসারীরা এবং আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী নেওয়া পশু-পাখির জোড়াগুলো। বাইরে থেকে হয়তো মনে হতো, এমন ভয়াবহ ঝড়ে একটি কাঠের নৌকা ভেসে থাকতে পারে না, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছাই ছিল তার নিরাপত্তার একমাত্র গ্যারান্টি।

এই সময়ে নূহ (আ.) তাঁর এক অবিশ্বাসী ছেলেকে নৌকায় ডাকলেন। কুরআনে আল্লাহ বলেন, “আর নূহ তাঁর ছেলেকে ডাকলেন, সে তখন নৌকার বাইরে আলাদা ছিল। নূহ বলল, হে আমার ছেলে! তুমি আমাদের সাথে ওঠে এসো, কাফিরদের সাথে থেকো না। সে বলল, আমি পাহাড়ে আশ্রয় নেব, এটি আমাকে রক্ষা করবে। নূহ বললেন, আজ আল্লাহর আদেশ থেকে কোনো রক্ষাকারী নেই, শুধুমাত্র তিনি যাকে রহমত করবেন।” (সূরা হূদ 11:42-43)।

নূহ (আ.)-এর সেই ছেলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস না রাখায় পাহাড়ে উঠল, কিন্তু বিশাল ঢেউ এসে তাকে গ্রাস করে নিল। নূহ (আ.) তাঁর প্রিয় সন্তানকে হারানোর কষ্টে মুষড়ে পড়লেন। তিনি আল্লাহর কাছে মিনতি করে বললেন, হে আল্লাহ, আমার সন্তান তো আমার পরিবারভুক্ত, তুমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে আমার পরিবারকে রক্ষা করবে। তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, হে নূহ, সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়, কারণ সে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আল্লাহর পক্ষ থেকে এই ঘোষণা ছিল স্পষ্ট যে রক্তের সম্পর্ক নয়, বরং ঈমান আর সৎকর্মই প্রকৃত সম্পর্কের ভিত্তি।

নৌকাটি চলতে থাকল দিন-রাত, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস। চারদিক শুধু পানি আর পানি। পৃথিবীর সমস্ত নগর, বসতি, বাগান, ক্ষেত-খামার সবকিছু পানির নিচে চলে গেল। যারা একসময় নূহ (আ.)-কে উপহাস করেছিল, তাদের চিহ্নও আর রইল না। এভাবেই আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করলেন।

অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে আকাশ থেকে পানি নামা বন্ধ হলো এবং পৃথিবী নিজের পানি শুষে নিল। ধীরে ধীরে পানি নেমে গেল এবং নৌকাটি ভেসে গিয়ে এক পাহাড়ের উপর স্থির হলো। কুরআনে উল্লেখ আছে— “এবং বলা হলো, হে পৃথিবী! তোমার পানি শুষে নাও, হে আকাশ! তোমার পানি ধরে রাখো। তখন পানি কমে গেল, কাজ সম্পন্ন হলো এবং নৌকাটি জুদী পাহাড়ের উপর স্থির হলো। আর বলা হলো, ধ্বংস হোক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।” (সূরা হূদ 11:44)।

ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয় যে, এই জুদী পাহাড় বর্তমান ইরাক বা তুরস্ক অঞ্চলে অবস্থিত। পানি কমে আসার পর নূহ (আ.) ও তাঁর অনুসারীরা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। তাঁরা বুঝলেন যে তাঁরা আল্লাহর রহমতে রক্ষা পেয়েছেন। নূহ (আ.) তখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, যেন তিনি তাঁদেরকে বরকতময় জীবন দান করেন এবং অবিশ্বাসী মানুষদের থেকে মুক্ত রাখেন।

কুরআনে তাঁর দোয়া উল্লেখ আছে— “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে আশ্রয় দিন বরকতময় স্থানে, আর আপনি হচ্ছেন সর্বোত্তম আশ্রয়দানকারী।” (সূরা মুমিনুন 23:29)।

নূহ (আ.)-এর এই মোনাজাত ছিল কৃতজ্ঞতার প্রতীক, যেখানে তিনি শুধু নিজের রক্ষা নয়, বরং নতুন জীবনের জন্য আল্লাহর বরকত কামনা করেছিলেন। তাঁর এই দোয়া কবুল হলো, এবং তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা পৃথিবীতে নতুনভাবে জীবন শুরু করলেন।

এই নতুন সূচনাই ছিল মানবজাতির ইতিহাসে এক বিরাট মোড়। আদম (আ.)-এর পর নূহ (আ.) দ্বিতীয় পিতার মর্যাদা লাভ করেন। তাঁর অনুসারীদের থেকেই পরবর্তী প্রজন্মের বিস্তার ঘটে। তাঁর জাতির ধ্বংস হয়ে যাওয়া মানুষরা ইতিহাসের শিক্ষা হয়ে রইল।

নূহ (আ.) দীর্ঘ জীবনযাপন করেছিলেন। তিনি প্রায় ৯৫০ বছর ধরে তাঁর জাতিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, যা কুরআনে উল্লেখ আছে— “আর আমি নূহকে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করলাম, তিনি তাঁদের মধ্যে হাজার বছরের কম পঞ্চাশ বছর অবস্থান করলেন।” (সূরা আনকাবুত 29:14)। এত দীর্ঘ সময় দাওয়াত দেওয়ার পরও তাঁর অনুসারীরা সংখ্যায় অল্প ছিল, যা মানব ইতিহাসে ধৈর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি তাঁর জাতিকে আবারও উপদেশ দিলেন। তিনি বললেন, তোমরা সর্বদা আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না। তিনি তাঁদেরকে আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন এবং তাঁদের জন্য দোয়া করলেন।

হযরত নূহ (আ.) পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগে তাঁর সন্তানদের বলেছিলেন, তোমরা সর্বদা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর সাক্ষ্য দেবে, কারণ আসমান ও জমিন এই শব্দের জন্যই সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, শিরক থেকে বেঁচে থাকবে, কারণ যে শিরক করবে, সে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে।

হযরত নূহ (আ.)-এর জীবনী আমাদের শেখায় ধৈর্যের মূল্য, তাওহীদের গুরুত্ব এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা। তিনি ছিলেন এক মহাপুরুষ, যিনি শত শত বছর ধরে অবিশ্বাসীদের উপহাস, প্রত্যাখ্যান আর নির্যাতন সত্ত্বেও নিজের দাওয়াত চালিয়ে গেছেন। তিনি আমাদের জন্য এমন এক দৃষ্টান্ত, যেখানে মানুষকে সঠিক পথে ডাকার ক্ষেত্রে ক্লান্তি বা হতাশার কোনো স্থান নেই।

আশা করি হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর এই জীবনী থেকে আপনি মূল্যবান শিক্ষা পেয়েছেন। ইসলামিক ইতিহাস ও শিক্ষার আরও গভীর ও বিস্তারিত আলোচনা নিয়মিত পেতে আমাদের ব্লগটি সাবস্ক্রাইব করুন। আপনার প্রতিটি সাবস্ক্রিপশন আমাদের অনুপ্রাণিত করবে আরও গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়স্পর্শী কন্টেন্ট তৈরি করতে। এখনই সাবস্ক্রাইব করুন এবং আমাদের সাথে থাকুন জ্ঞানের আলোয় ভরা এই যাত্রায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ