তাকদীর যদি পূর্ব নির্ধারিত হয়ে থাকে, তবে চেষ্টা কেন জরুরি?
আমরা জানি আল্লাহ সব কিছু আগে থেকেই জানেন—আমাদের জন্ম, মৃত্যু, জীবনপথ, সুখ-দুঃখ সবই তাঁর জ্ঞানের মধ্যে রয়েছে। অনেকেই এখানেই প্রশ্ন করে বসে, যদি সব কিছু আল্লাহ আগে থেকেই জেনে রাখেন এবং নির্ধারণ করে দেন, তাহলে কি আমরা নিজের ইচ্ছা দিয়ে কিছু করতে পারি? আমরা চেষ্টা করলেও কি তাঁর পরিকল্পনার বাইরে যেতে পারব না? আর যদি না পারি, তাহলে আমল করার মানে কী? অনেক সময় নাস্তিক বা সংশয়বাদীরা এই প্রশ্নটিকে ইসলাম নিয়ে সন্দেহ তৈরির জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু আসলে এটা গভীরভাবে বুঝলে পরিষ্কার হবে—এখানে কোনো বিরোধ নেই, বরং আল্লাহর জ্ঞান ও মানুষের ইচ্ছা একই সঙ্গে সত্য।প্রথমেই বুঝতে হবে, আল্লাহর জ্ঞান আর মানুষের স্বাধীনতা দুইটি আলাদা বিষয়। আল্লাহ সময়, স্থান, অতীত-ভবিষ্যৎ—সব কিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি আমাদের ভবিষ্যতের কাজগুলো আগে থেকেই জানেন, কারণ তাঁর কাছে সময় কোনো বাধা নয়। কিন্তু তিনি জানেন বলে আমরা সেই কাজ করতে বাধ্য হচ্ছি—এটা ঠিক নয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক জানেন, কোন ছাত্র পরীক্ষায় কেমন করবে। তিনি হয়তো নিশ্চিত জানেন, একজন ছাত্র পাশ করবে না। কিন্তু শিক্ষক জানেন বলে কি সেই ছাত্র ফেল করতে বাধ্য হচ্ছে? না, ছাত্রের নিজের সিদ্ধান্ত, পড়াশোনা না করাই তার ফেল হওয়ার কারণ। ঠিক তেমনই, আল্লাহ জানেন তুমি কী করবে, কিন্তু সেই কাজ তোমার নিজের ইচ্ছা ও চেষ্টা থেকে আসে। আল্লাহ আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছেন, আর আমরা যেভাবে কাজ করি, আল্লাহ আগে থেকেই তা জানেন।
কুরআনে আল্লাহ বলেন,
"মানুষের জন্য রয়েছে কেবল যা সে চেষ্টা করবে।"
(সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৯)
এখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে, চেষ্টা ও আমল আমাদের দায়িত্ব। আমরা যে সিদ্ধান্ত নেই, যে কাজ করি, আল্লাহ সেই কাজের জন্যই আমাদের বিচার করবেন। আবার সূরা আল-হাজ্জ (২২:৭)-এ আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন যা আসমান ও জমিনে আছে।” এখানে আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞানের কথা এসেছে, যা সব কিছুকে ঘিরে রেখেছে। তাই দেখা যাচ্ছে, আল্লাহর জ্ঞান ও আমাদের দায়িত্ব একসাথে বিদ্যমান।
নাস্তিকরা বলে, যদি সব কিছু পূর্ব নির্ধারিত হয় তাহলে বিচার অন্যায় হবে। কিন্তু তারা ভুলে যায় যে পূর্ব নির্ধারণ মানে জোর করে করানো নয়। তাকদীরের মধ্যে আমাদের ইচ্ছা ও চেষ্টা অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ আমাদের সামনে ভালো ও মন্দ—দুই পথই খুলে দিয়েছেন।
সূরা আল-ইনসান-এ আল্লাহ বলেন,
"আমরা মানুষকে পথ দেখিয়েছি — সে চাইলে কৃতজ্ঞ হবে, চাইলে অকৃতজ্ঞ হবে।"
(সূরা আল-ইনসান ৭৬:৩)
এই আয়াত প্রমাণ করে, সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে। আমরা কোন পথ বেছে নেব তা আমরা নির্ধারণ করি, কিন্তু আল্লাহ জানেন আমরা কী বেছে নেব।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আল্লাহ আমাদের আমলকে তাঁর পরিকল্পনার অংশ করেছেন। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া কিছু ঘটে না, কিন্তু তাঁর ইচ্ছার মধ্যেই আমাদের স্বাধীনতা কাজ করে। যেমন বিদ্যুতের ব্যবস্থা পুরো শহরে আছে—কিন্তু লাইট জ্বালানো বা নিভানো তোমার হাতে। বিদ্যুতের ক্ষমতা সব সময় আছে, কিন্তু ব্যবহার করবে কিনা তা তোমার সিদ্ধান্ত। তেমনি, আল্লাহর ইচ্ছা সব কিছুর মূল, কিন্তু আমল করা বা না করা আমাদের সিদ্ধান্ত।
রাসুল ﷺ বলেছেন,
"প্রত্যেক মানুষ তার জন্য নির্ধারিত কাজেই সহজ হয়ে যায়।"
(সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ আল্লাহ তোমাকে সেই পথে সহজ করে দেবেন যা তুমি বেছে নেবে। তুমি যদি ভালো পথ বেছে নাও, তিনি তোমাকে তাতে সহায়তা করবেন। তুমি যদি খারাপ পথ বেছে নাও, তিনি তোমাকে তাতে ছেড়ে দেবেন। তাই আমল করা অপরিহার্য, কারণ সেটিই আমাদের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করবে।
ফ্রি উইল (Free Will) এবং ডিটারমিনিজম (Determinism) নিয়ে দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের বহু গবেষণা আছে। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানও বলে, ভবিষ্যৎ অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাবনার উপর নির্ভরশীল। মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, আর সেই সিদ্ধান্তের ফলাফল পরিবর্তন আনছে। ইসলামও একই কথা বলে—তুমি সিদ্ধান্ত নেবে, কিন্তু ফলাফল আল্লাহর হাতে।
যেমন একজন নাবিক সমুদ্রের ঢেউ থামাতে পারে না (এটা আল্লাহর ইচ্ছা), কিন্তু নিজের নৌকার দিক সে নির্ধারণ করতে পারে (এটা মানুষের ইচ্ছা)। এই দুইয়ের সমন্বয়ই জীবনের বাস্তবতা।
সবশেষে বলা যায়, সব কিছু পূর্ব নির্ধারিত হলেও আমল করার মানে হারায় না। কারণ, তাকদীরের মধ্যেই আমাদের ইচ্ছা ও চেষ্টা লেখা আছে। আল্লাহ জানেন আমরা কী করব, কিন্তু আমরা সেই কাজ আমাদের নিজস্ব ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত দিয়ে করছি। এই কারণে আল্লাহ ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচার করবেন—যিনি ভালো কাজ করেছেন, তিনি পুরস্কার পাবেন; যিনি খারাপ কাজ করেছেন, তিনি শাস্তি পাবেন।
তাই মুসলিমের উচিত—তাকদীরের উপর ভরসা রেখে আমলে অবিচল থাকা। আল্লাহর পরিকল্পনার বাইরে কিছু নেই, কিন্তু সেই পরিকল্পনার মধ্যেই তোমার প্রতিটি ভালো কাজ, প্রতিটি চেষ্টা, আর প্রতিটি দোয়া জায়গা করে নেয়।
আমল করো, কারণ আল্লাহ তোমার চেষ্টা দেখছেন, আর তোমার সেই চেষ্টাই তোমার আখিরাতের চাবি।
প্রিয় পাঠক, যদি এই লেখা আপনার ভালো লেগে থাকে এবং আপনি ইসলামের এমন আরও তথ্য অনুপ্রেরণাদায়ী কাহিনী জানতে চান—আমাদের Youtube , Facebook , Instagram Channel ফলো করে পাশে থাকবেন
আপনার মতামত কমেন্টে লিখুনবন্ধু ও পরিবারের সাথে শেয়ার করুন
আপনার একটি শেয়ার দাওয়াতের কাজে ছোট হলেও একটি সওয়াবের বিনিয়োগ হতে পারে। আল্লাহ কবুল করুন।
কোরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন গড়ুন। Story Of Islam সাথেই থাকুন।

0 মন্তব্যসমূহ